Breaking News

আইডিয়াথন ৪.০: এসআইটিতে উদ্ভাবন ও সম্ভাবনার মিলনমেলা

Image
 

ভাস্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি:

বর্তমান সময়ে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা আর কারও কাছে অজানা নয়। তবে কেবল প্রযুক্তিগত শিক্ষাই যথেষ্ট নয়; প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা, সমস্যা-সমাধানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ। এই ভাবনাকেই কেন্দ্র করে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ আইডিয়া-ভিত্তিক উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা আইডিয়াথন ৪.০ (Ideathon 4.0)। গত ২০ জানুয়ারি শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (SIT)-এর উদ্যোগে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে এই প্রতিযোগিতা পরিণত হয় নতুন চিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান এবং সামাজিক সমস্যার কার্যকর উত্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে, যেখানে পড়ুয়ারা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের সৃজনশীল ভাবনার প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পায়।

এবছর দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে মোট ৮০টিরও বেশি দল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনলাইন স্ক্রিনিং ও আইডিয়া মূল্যায়নের মাধ্যমে ২৫টি দলকে চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত করা হয়। অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে এই চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয় শতাধিক প্রতিযোগী, যাঁরা এসআইটি ক্যাম্পাসে এক প্রাণবন্ত ও উদ্দীপনাময় পরিবেশ সৃষ্টি করেন। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে, যা জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিরোরি মাল কলেজের অধ্যাপক প্রফেসর অংশু এবং প্রফেসর পুষ্পেন্দ্র কুমার। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গরিমা আরও বৃদ্ধি করে। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসআইটির প্রিন্সিপাল-ইন-চার্জ . জয়দীপ দত্ত, কলেজ অব প্রফেশনাল স্টাডিজ, এসআইটির প্রিন্সিপাল-ইন-চার্জ . অরুন্ধতী চক্রবর্তী, সহ বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিশিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।

স্বাগত ভাষণে এসআইটি কর্তৃপক্ষ আইডিয়াথন ৪.০ (Ideathon 4.0) আয়োজনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যাকে চিহ্নিত করে সৃজনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান খুঁজে বের করার দক্ষতা অর্জন করাই আজকের মূল প্রয়োজন। আইডিয়াথন ৪.০ (Ideathon 4.0) সেই লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মুক্ত চিন্তার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণকারী দলগুলো স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্মার্ট সিটি, ডিজিটাল শিক্ষা, কৃষি উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নারী নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করে। প্রতিটি দল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের আইডিয়া প্রেজেন্টেশন ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেয়। বিচারকমণ্ডলী দলগুলোর মূল্যায়ন করেন উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের বাস্তবসম্মত পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, উপস্থাপনার দক্ষতা, দলগত সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের উপর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব—এই সবকটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে। বিচারকরা অংশগ্রহণকারীদের আইডিয়ার প্রশংসা করেন এবং বহু ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে সেগুলি বাস্তবায়নের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।

আইডিয়াথন ৪.০ (Ideathon 4.0)-এর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে এসআইটি কর্তৃপক্ষ জানান, এই প্রতিযোগিতার লক্ষ্য কেবল প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করা নয়। বরং প্রতিটি প্রতিশ্রুতিশীল ধারণাকে চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদে তা বিকশিত করার দিকেই তাদের বিশেষ নজর। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব আইডিয়ার মধ্যে বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলিকে এসআইটির বিশেষজ্ঞ মেন্টর ও ফ্যাসিলিটেটরদের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে গাইড করা হবে এবং ভবিষ্যতে কার্যকর প্রজেক্ট প্রোটোটাইপে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হবে—যা এই আইডিয়াথন ৪.০ (Ideathon 4.0) উদ্যোগকে অন্য অনেক প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করে তোলে।

ফলাফল ঘোষণায় দেখা যায়, স্কুল বিভাগে নির্মলা কনভেন্ট সেন্ট জোসেফ স্কুলের যৌথ দল টিম গ্রেথার প্রথম স্থান অধিকার করে। কলেজ বিভাগে শীর্ষস্থান অর্জন করে শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির টিম টেকনোলজি হেল। উভয় বিভাগের বিজয়ী দলকে নগদ ১০,০০০ টাকা করে পুরস্কার, ট্রফি ও শংসাপত্র প্রদান করা হয়। এছাড়াও সকল চূড়ান্ত পর্বের অংশগ্রহণকারীদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথিরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আজকের আইডিয়াই আগামী দিনের স্টার্ট-আপ ও সামাজিক পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক হতে পারে। তাঁরা শিক্ষার্থীদের ভয় না পেয়ে নতুন কিছু করার সাহস রাখার আহ্বান জানান এবং এসআইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলির এই ধরনের উদ্যোগকে ভবিষ্যৎ ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। সমগ্র অনুষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনায় এসআইটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা, স্বেচ্ছাসেবক ছাত্রছাত্রী এবং আয়োজক কমিটির সদস্যদের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতা শেষ হয় অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের পারস্পরিক মতবিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আশাবাদের মধ্য দিয়ে। সব মিলিয়ে, আইডিয়াথন ৪.০ (Ideathon 4.0) আবারও প্রমাণ করল যে শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি শুধু প্রযুক্তিশিক্ষার কেন্দ্রই নয়, বরং উদ্ভাবন, গবেষণা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করার এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম।

Share With:


Leave a Comment

  

Other related news